আলোচনা
[বর্ষামঙ্গলে কয়েকটি গান পাবার পর] আমার মনে হল গুরুদেব তো বেহাগসিদ্ধ, বর্ষামঙ্গলের গান বেহাগ রাগিণীতে লিখতে অনুরোধ করলে কেমন হয়। ওঁর লেখার টেবিলের ওপরে একটা চিরকুটে 'বেহাগ' লিখে কাগজ চাপা দিয়ে চলে এলাম।
উনি সকালবেলায় প্রাতরাশ সেরে এসে লেখার টেবিলে বসতেই চোখের সামনে পড়ল লেখাটা। দেখলেন 'বেহাগ'। তাঁর দেখাশুনা করত বনমালী। তিনি ডাকলেন--বনমালী এদিকে আয়। বনমালী কাছে গেলে উনি বললেন --"দেখ্তো কাণ্ড। সকালবেলায় এসেছি কত কিছু লিখব বলে, না, ওদের হুকুম রাখতে হবে। বেহাগে গান লিখতে হবে, আমার আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই"। বনমালীকে একেবারে অনেক কিছু বলে ফেললেন। ও তো কিছুই বুঝল না, হেসে হেসেই উড়িয়ে দিল।
আমি যখন গেলাম খবর নিতে গান হয়েছে কিনা, তখন বনমালী দৌড়ে এসে বলল-- "খুব হইলো গো, খুব হইল, খুব হইছে, খুব জমিছে, গান হইল আর কি!" ও খুব রসিক ছিল। আমাকে পিঠে ধাক্কা দিয়ে ওঁর কাছে পাঠিয়ে দিল। "তুমি এইরকম লিখেছো?" -- আমায় বললেন। "হ্যাঁ লিখেছি", অস্বীকার করবো কেন? উনি নিজের মনেই বললেন -- "গান লিখতে হবে। কী আব্দার"! সেই বেহাগে পেলাম এই গান: 'আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে'।
১৯৩৯ সন। বর্ষামঙ্গলের প্রস্তুতি চলছিল। ... আমি গুরুদেবকে বললাম যে, ছেলেমেয়েরা বলছে নতুন গান চাই, পুরানো গানে ওরা আর বর্ষামঙ্গল করবে না। গুরুদেব বললেন-- এই অল্প সময়ের মধ্যে কি করে আর নতুন গান লেখা যায়? অন্য অনেক কাজও তো আছে। সেদিন এই পর্যন্ত। পরদিন বেলা এগারোটায় গুরুদেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নতুন লেখা একটি গান হাতে দিলেন। গানটি -- 'ওগো সাঁওতালি ছেলে' । দ্বিতীয় গান 'বাদলদিনের প্রথম কদমফুল' পেলাম তার পরের দিনই। ... [টেবিলে 'বেহাগ' লিখে রেখে আসার পর] সেই বেহাগে পেলাম এই গান -- 'আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে' । তার পরের দিন আবার কাগজে লিখে এলাম 'ইমন', পেলামও-- 'এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও' গানটি। এবার আবার কাগজে লিখে রেখে দিয়ে এলাম-- 'তান দেওয়া গান'। পেয়ে গেলাম-- 'শ্রাবণের গগনের গায়' ।
সব শুদ্ধ হল পাঁচটি নতুন গান। ষষ্ঠ গানটি, 'আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে' , গুরুদেব নিজে থেকে লিখলেন। ছটি নতুন গান লেখার পর গুরুদেব বললেন-- তোমার কাজ তো হয়ে গেল, এবার তুমি থামো। আমি বললাম -- এক ডিজিটের মূল্য কি? অন্তত দুটো ডিজিট করে দিন, একের পাশে অন্তত শূন্য চাই।
পরের গান যেটি পেলাম সেটি 'স্বপ্নে আমার মনে হল' । পরের গানটি পেলাম-- 'এসেছিলে তবু আস নাই' । এটি শ্রীমতী অমিতা ঠাকুরের উদ্দেশে লেখা। 'এসেছিনু দ্বারে তব' , 'নিবিড় মেঘের ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে' এই গান দুটি পর পর পেয়ে গেলাম। এর পরেই কবি বললেন-- একের পরে শূন্য বসে গেল, এবার শেষ। আমি বললাম-- শূন্যের কোন মূল্যই নেই, একের পাশে অন্তত দুই বসিয়ে এক ডজন করে দিন।
পরের দিন আবার কাগজে 'কীর্তন', 'বাউল' কথা দুটি লিখে চাপা দিয়ে রেখে এলাম লেখার টেবিলে। সেই সূত্রে পাওয়া গেল-- 'পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে' । তার পরের বারো নম্বর গানটি হল-- 'শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে' ।
এভাবে বারোটি গান শেষ করে গুরুদেব বললেন-- আমাকে অন্য কাজে মন দিতে হবে, এবারে তুমি থামো, তুমি বুঝতে পারছ না তোমার ওপর আশ্রমের অনেকেই অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। বর্ষামঙ্গলেরও তো দেরি হয়ে যাচ্ছে।
সেদিন হাতজোড় করে বলেছিলাম--ষোলকলায় পূর্ণ করে দিন, আর চাইব না। 'আজি মেঘ কেটে গেছে' লেখা হল। এরপর আবার গানের অনুরোধ করে সেই একই উপায়ে কাগজে 'বাগেশ্রী' কথাটি লিখে রেখে এলাম।... পরদিন বাগেশ্রীতে পেলাম 'সঘন গহন রাত্রি' ।...পরের গানটি 'ওগো তুমি পঞ্চদশী' ।
[পরে লাইব্রেরীর বারান্দায় নতুন পনেরোটি গান নিয়ে বর্ষামঙ্গল আরম্ভ হল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে মাঝপথে অনুষ্ঠান বন্ধ করে রবীন্দ্রনাথকে চলে যেতে হয়। কয়েকদিন পরে 'বাসি বর্ষামঙ্গল' নাম দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি করার কথা উঠলো] সেদিন সকালবেলা অনুষ্ঠান-সূচী নিয়ে আমি যখন গুরুদেবের কাছে গেলাম তখন গুরুদেব বললেন-- এখনই যদি আমি তোমাকে একটা নতুন গান শিখিয়ে দিই তাহলে সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের দিয়ে গাওয়াতে পার কি? এটা হলে তোমার প্রস্তাব মত ষোলটি গান হয়ে যায়, ষোলকলা পূর্ণ হয়। আমি তখনই রাজী। সেই নতুন গানটি হল -- 'যবে রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা' ।
--শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যাত্রাপথের আনন্দগান, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৮৫
|
১২৭ আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারেযে কথা শুনায়েছি বারে বারে॥ আমার পরানে আজি যে বাণী উঠিছে বাজি অবিরাম বর্ষণধারে॥ কারণ শুধায়ো না, অর্থ নাহি তার, সুরের সঙ্কেত জাগে পুঞ্জিত বেদনার। স্বপ্নে যে বাণী মনে মনে ধ্বনিয়া উঠে ক্ষণে ক্ষণে কানে কানে গুঞ্জরিব তাই বাদলের অন্ধকারে॥ |
বিবিধ তথ্য ও আলোচনা
১৯৩৯ সনের পশ্চাৎপট: