গীতবিতান-GITABITAN
হে নবীনা

Group

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩৪০ (১৯৩৩)
কবির বয়স: ৭২
প্রকাশ: ভাদ্র ১৩৪০ , তাসের দেশ র-র ২৩
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম-প্রেমবৈচিত্র্য; ৯৭/৩১০
রাগ / তাল: ভৈরবী-বাউল / দাদরা
স্বরলিপি: সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা; স্বরবিতান ১ ;স্বরবিতান ১২ (তাসের দেশ)
স্বরলিপিকার: শান্তিদেব ঘোষ; ঐ; ঐ
পাদটিকা:
১ম দৃশ্য, রাজপুত্রের গান।  

আলোচনা

ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তর্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  



আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

৯৭

            হে নবীনা,
   প্রতিদিনের পথের ধুলায় যায় না চিনা॥
   শুনি বাণী ভাসে   বসন্তবাতাসে,
   প্রথম জাগরণে দেখি সোনার মেঘে লীনা॥
স্বপনে দাও ধরা     কী কৌতুকে ভরা।
   কোন্‌ অলকার ফুলে   মালা সাজাও চুলে,
কোন্‌ অজানা সুরে   বিজনে বাজাও বীণা॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯৩৩  সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'কমলা বক্তৃতামালা'য় বক্তৃতাদান (জওহরলাল নেহরুর স্ত্রীর স্মরণে বক্তৃতাগুচ্ছ)। বোম্বাই, ওয়ালটেয়ার, হায়দ্রাবাদ সফর। বিশ্বভারতীর জন্য নিজাম একলক্ষ টাকা দান করলেন। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে 'কৃষ্ণস্বামী আয়ার বক্তৃতামালা' ও ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিলেন। প্রকাশ: দুই বোন (উপন্যাস), মানুষের ধর্ম (কমলা লেক্‌চার্স), বিচিত্রিতা (কবিতা), চণ্ডালিকা (নাটিকা), তাসের দেশ (নাটিকা), বাঁশরী (নাটক), ভারতপথিক রামমোহন রায় (প্রবন্ধ), বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ (প্রবন্ধ), শিক্ষার বিকিরণ (প্রবন্ধ)।

বহির্বিশ্বে: ২৮শে জানুয়ারি এক সভাতে চৌধুরি রহমৎ আলি ভারত বিভাজনের কথা তোলেন -- পাকিস্তান শব্দের উৎপত্তি হয় (P for Punjab, A for Afghanistan, K for Kashmir, S for Sind and tan for Baluchistan)। ফিলিপিন্‌কে স্বাধীনতা দেবার সিদ্ধান্ত। হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর এবং একনায়কত্বের অধিকার প্রাপ্ত। ইহুদি বয়কট আন্দোলন ও প্রথম কন্‌সেন্‌ট্রেশন ক্যাম্প। আমেরিকা সোভিয়েট রাশিয়াকে স্বীকৃতি দেয়। জার্মানিতে নাৎসী দল ছাড়া আর সব রাজনৈতিক দল বেআইনি, বইয়ের বহ্ন্যুৎসব। ১৫ অগাস্ট কলকাতায় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্ট্‌স স্থাপনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। সাপ্তাহিক 'দেশ' পত্রিকার প্রকাশ। ক্রিকেট খেলোয়াড় রণজিৎ সিং, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত (অন্তরীণ অবস্থায়) ও অ্যানি বেসান্তের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: গড্‌স লিট্‌ল একর (কল্ডওয়েল), দি ব্লাড ওয়েডিং (লোর্কা), ম্যান্‌স ফেট (মাল্রো), লস্ট হরাইজন ( হিলটন), মডার্ণ ম্যান ইন সার্চ অফ এ সোল (ইয়ুং), হিস্ট্রি অফ দি রাশিয়ান রেভোল্যুশন (ট্রট্‌স্কি), পোয়েম্‌স (স্পেণ্ডার), কালেক্টেড পোয়েম্‌স (ইয়েট্‌স)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



একথা বলা যায় যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম ভারতীয় composer. সদারঙ  প্রভৃতি প্রাচীন সুরকারদের ইওরোপীয় আদর্শে ঠিক composer বলবার উপায় নেই, কারণ তাঁরা তাঁদের সৃষ্টিগুলো নির্দিষ্টভাবে বেঁধে যেতে পারেননি। এখন আমাদের হাতে যা প্রমাণ আছে তা থেকে তার যথার্থ মূল্য নির্ধারণ করা অসম্ভব। তাঁদের রচিত সুরগুলি এত বিভিন্ন ও বিকৃতভাবে পাই যে তা থেকে তাদের মূল রূপ সম্বন্ধে কোনো ধারণাই করা যায় না, এবং এই বিকৃতির জন্য দায়ী আমাদের দেশের 'গায়কী' পদ্ধতি। রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই 'গায়কী' পদ্ধতির পরিবর্তন করেন -- আমাদের দেশে তিনিই প্রথম জোর দিয়ে বলেন যে সুরকারের সৃষ্টি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়, তার ওপর একচুল অদল-বদল করবার অধিকার কোনো গায়কের নেই। সুরের এই নির্দিষ্ট রূপের ওপর জোর দেয়াটাই composer-এর প্রথম লক্ষণ। কবির রচিত কবিতা যেমন একটি সম্পূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় জিনিস, অতি বড় পাঠকেরও অধিকার নেই নিজের পছন্দমত কবিতার কথা বদ্‌লে নেবার, তেমনি গানের সুরও যে সুরকারের নির্দিষ্ট একটি সৃষ্টি তাতে কোনো রকম অদল-বদলই চলে না এ ধারণা আমাদের দেশে একেবারেই ছিল না, একথা রবীন্দ্রনাথই প্রথম আমাদের মাথায় ঢুকিয়েছেন। দশ পনেরো বছর আগে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান 'আমার মাথা নত ক'রে দাও হে তোমার' ইমনকল্যাণ থেকে ভৈরবীতে পরিবর্তিত হয়ে রেকর্ডে প্রকাশিত হয় এবং 'একদা তুমি প্রিয়ে'র ঝাঁপতাল থেকে দাদরায় পরিবর্তন ঘটে -- সেও রেকর্ড। কিন্তু আজ রেকর্ড কোম্পানীগুলো রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুমোদন ব্যতীত তাঁর কোনো সুর প্রকাশ করতে সাহস পায় না; সুরকারকে এতখানি স্বীকার করা রবীন্দ্রনাথের বিরাট ব্যক্তিত্বের ফলেই সম্ভব হয়েছে, এবং এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে ভবিষ্যতের সুরকারদের পথ তিনিই সুগম করেছেন।  
     --হিমাংশুকুমার দত্ত, সুরকার রবীন্দ্রনাথ, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)