গীতবিতান-GITABITAN
কোন্‌ ভীরুকে ভয় দেখাবি, আঁধার তোমার সবই মিছে।

Portrait

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ভাদ্র ১৩৩০ ( ১৯২৩)
কবির বয়স: ৬২
প্রকাশ: ভাদ্র, ১৩৩০ , গান(উপাসনা) |
প্রবাসী;প্রবাহিণী(পূজা)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা ও প্রার্থনা-প্রবাহিণী; ৮০/৮৫৭
রাগ / তাল: পিলু-খাম্বাজ-বাউল / দাদরা
স্বরলিপি: স্বরবিতান ২
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাদটিকা:
১৯২৩ আগস্টে এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চে বিসর্জন নাটকের অভিনয়কালে গানটি গাওয়া হয়। কাব্যে, নাটকে, অনুষ্ঠানপত্রে নানা পাঠ পাওয়া যায়, তার মধ্যে দুয়েকটি মুদ্রণপ্রমাদ মাত্র।
পাঠভেদ:
সামনে কি তোর ভরসা যত
    [ স্বর ২] ১ম সং ১৩৪৩।  
[ গী-গ্র ]  

আলোচনা

সেবার কলকাতায়, যতদূর মনে পড়ে ১৯২৩ সালের আগস্ট মাসে হবে বোধহয়, এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটক অভিনীত হয় চারদিন ধরে। জয়সিংহের ভূমিকায় নেমেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আর বিশিষ্ট ভূমিকাগুলিতে নেমেছিলেন--

    রঘুপতি - দিনুদা (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর); অপর্ণা - কুমারী রাণু অধিকারী (পরে লেডি রাণু মুখার্জি) ও কুমারী মঞ্জু ঠাকুর (সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা, ইনি একদিনই অভিনয় করেছিলেন); গোবিন্দমাণিক্য - রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর; গুণবতী - সংজ্ঞা দেবী (সুরেন্দ্রনাথের স্ত্রী); নক্ষত্র রায় - তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র)। (১২৪)  

গোটা দশেক গান দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাকেও এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। এই দশটি গানের মধ্যে 'বিসর্জন'-এর জন্যে আগেকার রচিত গান ছিল তিনটি। এই তিনটি গান হচ্ছে-- ' ওগো পুরবাসী '; ' আমি একলা চলেছি এ ভবে ' আর ' থাকতে আর ত পারলিনে মা '। এই তিনটি গান ছাড়াও কবির পুরনো গান থেকে কবি বেছে দেন-- ' তিমিরদুয়ার খোলো ' আর ' দিন ফুরালো হে সংসারী '-- এই গান দুটি। নতুন করে রচনা করে দেন আরও পাঁচটি গান। সেগুলি হচ্ছে-- ' ও আমার আঁধার ভালো '; ' কোন্‌ ভীরুকে ভয় দেখাবি '; ' আঁধার রাতে একলা পাগল '; ' আমায় যাবার বেলা পিছু ডাকে ' আর ' জয় জয় পরমা নিষ্কৃতি '। শেষের এই পাঁচটি গান আমাকে শেখান তাঁদের জোড়াসাঁকোর পুরানো বড় বাড়িতে (৬নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন) দোতলায় সামনের দিকের বসার ঘরে বসে। প্রতিটি গান তিনি নিজের হাতে লিখে দেন। ... তাঁর পায়ের কাছে বসে বসে গানগুলি শিখেছিলাম। কি যত্ন আর ভালোবাসা নিয়ে তিনি যে  গান শেখাতেন। ... গান জিনিসটা তাঁর কত প্রিয় ছিল, গান শুনতে যত ভালোবাসতেন শেখাতেও ততই ভালোবাসতেন। দুটোতেই দেখেছি সমান দরদ, সমানই আনন্দ পেতেন। নিজে গাইতেও ভালোবাসতেন। (১২৪)  
     --সাহানা দেবী, স্মৃতির খেয়া, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা, ২০০৪  



আমরা কাল [২১শে অগাস্ট, ১৯২৩ -  ১২ ভাদ্র ১৩৩০] এম্পায়ার থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের "বিসর্জন" নাটকের অভিনয় দেখিতে গিয়াছিলাম। "বিশ্বভারতী'র সাহায্য্কল্পে অভিনয়ের আয়োজন হইয়াছিল এবং প্রধানত উহারই ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকেরা প্রধান প্রধান চরিত্রের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। অভিনয়ের সাজসজ্জা বিশেষত বর্ণ-সমাবেশ, উচ্চ শিল্পকলার পরিচায়ক। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ জয় সিংহের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার অভিনয়চাতুর্যের বর্ণনা করা আমাদের সাধ্যায়ত্ত নয়। জয় সিংহের চরিত্রে লোকাচার ও ধর্ম, অন্ধ বিশ্বাস ও মানব হৃদয়ের মধ্যে পদে পদে যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ফুটিয়া উঠিয়াছে-- রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ে তাহা মূর্তিমান হইয়া দেখা দিয়াছিল। এরূপ উচ্চাঙ্গের অভিনয়কলা দর্শনের সৌভাগ্য সকল সময় হয় না। রাজার ভূমিকায় কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথ কৃতিত্ব প্রকাশ করিয়াছিলেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের পরেই রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথের অভিনয় উল্লেখ করিতে হয়। অপর্ণা ও রাণীর অভিনয়ও ভাল হইয়াছিল। শ্রীমতী সাহানা বসু মধুর সঙ্গীতে সকলকে মুগ্ধ করিয়াছেন। এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চ লোকে লোকারণ্য; দেখিয়া মনে হইল অভিনয়ের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে। আমরা 'বিসর্জন' অভিনয় দর্শনে বাস্তবিকই খুবই প্রীত হইয়াছি। (১৭২)
  
     --চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ১, আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দ পাবলিশার্স,১৯৯৩  


 

 

৮০

        কোন্‌ ভীরুকে ভয় দেখাবি,  আঁধার তোমার সবই মিছে।
        ভরসা কি মোর সামনে শুধু।  নাহয় আমায় রাখবি পিছে॥
        আমায় দূরে যেই তাড়াবি  সেই তো রে তোর কাজ বাড়াবি--
        তোমায় নীচে নামতে হবে  আমায় যদি ফেলিস নীচে॥
        যাচাই ক'রে নিবি মোরে  এই খেলা কি খেলবি ওরে।
যে তোর  হাত জানে না, মারকে জানে,  ভয় লেগে রয় তাহার প্রাণে--
যে তোর  মার ছেড়ে তোর হাতটি দেখে  আসল জানা সেই জানিছে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

W   HO is that Coward
  Whom, 0h, you dark!, want to frighten?
  All your attempts are really in vain -
all my help do not mere lie ahead
Be it - let me remain behind
  The moment you chase me far -
  it means for you, only more labour-
You will have to step down,
if you try to get me down -
  Do you want me to go through a test?
  To play such a game are you really set?
One who knows only the thrust
    not your hands -
  at heart only he is afraid -
but leaving your thrust
    one who your hand sees
    he is the one who really perceives.
  
     --Chitra Marjit, Songs to Remember : English Version of Selected Songs of Rabindranath Tagore, Biswa-Jnan, Calcutta  



১৯২৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  ৯ই জানুয়ারি বড়ো ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। প্রথম আসাম ও শিলং পাহাড়ে ভ্রমণ। বিশ্বভারতীর ট্রাস্ট ডীড করা হোলো আর প্রকাশন বিভাগের হোলো সূত্রপাত। 'বিসর্জন' অভিনয়ে জয়সিংহ। 'পূরবী' রচনা। প্রকাশ: বসন্ত, ছুটির পড়া, The Visva-Bharati.  

বহির্বিশ্বে: ১লা জানুয়ারি স্বরাজ্য পার্টির জন্ম -- দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও পণ্ডিত মতিলাল নেহরুর উদ্যোগে। স্পেনে একনায়কতন্ত্রের শাসন। নেপাল স্বাধীন। তুরস্কে গণতন্ত্র, আতাতুর্ক প্রথম রাষ্ট্রপতি। টেলিভিশন আবিষ্কার। সারা বার্নহার্ট ও পিয়ের লোতির মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ফিলজফি অফ সিভিলাইজেশন (সোয়াইৎজার), সেণ্ট জোন (শ), এরিয়েল (মরোয়া), দি ডাভ্‌স নেস্ট (ম্যানস্‌ফিল্ড)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


অবশ্য একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় যে রবীন্দ্রনাথের গান একঘেয়ে। এর মত ভুল কথা আর নেই। সাধারণ লোকের এরকম ধারণা হবার কারণ রবীন্দ্রনাথের গানের অফুরন্ত সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। যিনি প্রায় দু'হাজার গান লিখেছেন তাঁর কিছু-কিছু গান এক ঢংয়ের হতে বাধ্য; গায়ক-গায়িকারা অনেক সময় পর-পর অনুরূপ ঢংয়ের গান করেন ব'লে শ্রোতাদের মনে এই রকম ভ্রান্ত ধারণা জন্মায় যে রবীন্দ্রনাথের গান একঘেয়ে। আসলে তাঁর গানে সুরের বৈচিত্র্য যত বেশী কোনো ভারতীয় সুরকারের রচনায় আজ পর্যন্ত ততটা দেখা যায়নি; তাঁর বিভিন্ন গানগুলোর সুর বিশ্লেষণ ক'রে দেখলেই একথা স্পষ্ট হবে।  
     --হিমাংশুকুমার দত্ত, সুরকার রবীন্দ্রনাথ, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)