গীতবিতান-GITABITAN
শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা

Manuscript

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯৯ (১৮৯২)
কবির বয়স: ৩১
প্রকাশ: বৈশাখ, ১২৯৯ , সাধনা -শুধু |
গানের বহি (বিবিধ)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): বিচিত্র-বিচিত্র; ৬৯/৫৭৩
রাগ / তাল: বেহাগ / কাহারবা
স্বরলিপি: সঙ্গীত প্রকাশিকা (১৩১৬); বীণাবাদিনী (১৩০৪); স্বরবিতান ১০
স্বরলিপিকার: অনুল্লিখিত; ইন্দিরা দেবী; ঐ
পাদটিকা:
আস্থায়ীর একটা ২। ৪ ছন্দে স্বরলিপি আছে [স্বর ১০]।  

আলোচনা

বেহাগ। রবীন্দ্রনাথ বেহাগের সুরে যত সুন্দর-সুন্দর সুরনির্মাণ করেছেন, আর কোনো রাগ সম্ভবত তার পাশে দাঁড়াতে পারে না। সংখ্যায় না হলেও গুণে বুঝি বেহাগই কবির প্রিয়তম, আমাদের কাছে বেহাগই বুঝি সবচেয়ে বেশি নম্বর পাবে। গানের তালিকায় না গিয়ে আমরা বরং বেহাগের রাবীন্দ্রিকতার খোঁজেই যাই। রবীন্দ্র-বেহাগে খাম্বাজ প্রায়ই চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ে এবং তাকে আর ধরাই যায় না, কিন্তু বেহাগত্ব থাকে অক্ষুণ্ণ। এটা বাংলা বেহাগেরই একটা চরিত্র। শুধু একটিমাত্র স্বরের স্থান পরিবর্তনে এটি ঘটে যায় -- অবরোহতে প্রধানত শুদ্ধ নিষাদের স্থানে কোমল নিষাদ, এতে সুরের আবেদনে মরমিত্বের মাত্রা এসে যায়। রবীন্দ্রনাথের বেহাগের পর বেহাগে এই ব্যাপারটা ঘটে থাকে। এই কোমল নিষাদ হাজির হয় গানের অন্তরা বা সঞ্চারীতে। ...  অনেকে এই সুরকারুটিকে বিহাগড়া বলতে পারেন।  
     --সুধীর চন্দ, বহুরূপী রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৫  



 

 

৬৯

শুধু   যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা,
শুধু   আলো-আঁধারে কাঁদা-হাসা॥
শুধু   দেখা পাওয়া, শুধু ছুঁয়ে যাওয়া,
শুধু   দূরে যেতে যেতে কেঁদে চাওয়া,
শুধু   নব দুরাশায় আগে চ'লে যায়--
     পিছে ফেলে যায় মিছে আশা॥
     অশেষ বাসনা লয়ে ভাঙা বল,
     প্রাণপণ কাজে পায় ভাঙা ফল,
     ভাঙা তরী ধ'রে ভাসে পারাবারে,
     ভাব কেঁদে মরে-- ভাঙা ভাষা।
     হৃদয়ে হৃদয়ে আধো পরিচয়,
     আধখানি কথা সাঙ্গ নাহি হয়,
     লাজে ভয়ে ত্রাসে আধো-বিশ্বাসে
               শুধু আধখানি ভালোবাসা॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯২ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: এ বছর বারবার জমিদারির কাজে শিলাইদহ গেছেন। সপরিবারে শান্তিনিকেতনে কাটালেন কিছু সময়। অগাস্ট মাসে 'সঙ্গীত সমাজ'-এ যোগ দিয়ে গান শোনান আর সেখানে 'গোড়ায় গলদ'-এর অভিনয় হয়। প্রকাশ: চিত্রাঙ্গদা, গোড়ায় গলদ।

বহির্বিশ্বে: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় 'বেঙ্গল কেমিক্যাল্‌স্‌' স্থাপিত করলেন। আমেরিকান কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান ও ইংরেজ কবি অ্যালফ্রেড লর্ড টেনিসনের মৃত্যু। চাইকোভ্‌স্কির 'দি নাটক্র্যাকার' প্রকাশিত হোলো।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



... বাংলা গান বাণীপ্রধান, আপনি যতই সুরজ্ঞ হন, বাংলা গান শুনতে হ'লে কথার দিকে কিছু মন না দিয়ে উপায় নেই, এবং কথা খারাপ হ'লে উপভোগে কিছু অন্তত ব্যাঘাত যার না হয় বলতেই হবে তার অনুভূতিগুলি সম্পূর্ণ বিকশিত নয়। সেই জন্যে বাংলা গানের ভালো কবিতা হওয়া দরকার। বাংলা গান এমন হওয়া উচিত যা ছাপার অক্ষরে প'ড়েও ভালো লাগে। এ রকম কিছু গান লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, নজরুল ইসলাম -- তাঁদের সুখ্যাতি নিশ্চয় করবো; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গানের ছলে কাব্যের যে চোখ-ধাঁধানো, প্রাণ-কাড়ানো হিসেব-হারানো ঐশ্বর্য আমাদের ঘরের আঙিনায় ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার কথা আমরা কী বলবো? এ-গানগুলি শ্রেষ্ঠ কবিতা, রবীন্দ্রকাব্যের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ। আশ্চর্য এই যে দেড় হাজার দু'হাজার গানের মধ্যে প্রায় প্রতিটিই কবিতা হিসেবে সার্থক, বেশির ভাগই অনিন্দ্য। এ থেকে এটুকু বোঝা যায় যে তিনি নিজের মনে তাঁর গানে ও গীতিকবিতায় জাতের কোনো তফাৎ মানেন না, যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর নিজের কোনো কাব্যসংকলনেই এমন কোনো রচনা স্থান পায়নি যা নিছক গান।

... সমালোচককে মুখ খোলবার কোনো সুযোগই দেবে না রবীন্দ্রনাথের গান। গানগুলি যে-কোনো অর্থেই নিখুঁত। এমন একান্ত সরল, ঋজু, জাদুকর ভাষা রবীন্দ্রনাথ আর কোথাও ব্যবহার করেন নি। এত বিচিত্র ছন্দ, এমন চমক-লাগান অভিনব মিল, এমন ললিত মধুর অনুপ্রাস তাঁর কবিতায় নেই। অথচ পড়বার সময় কখনো এমন মনে হয় না যে এগুলো কবির কারিগরি, মনে  হয় সবই সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত, মনে হয় ছন্দ মিল অনুপ্রাস সব নিয়ে সম্পূর্ণ রচনা একটি সম্পূর্ণ ফুলের মতো আপনিই ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের সব গানেই এই একটি আত্মজ ভাব ধরা পড়ে, ওরা যেন একটা জৈব পদার্থ, কারো রচিত নয়; জীবজগত উদ্ভিদজগতের অফুরান বিচিত্রতার মতো ওরা শুধু আছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই, ব্যাখ্যার প্রয়োজনও নেই। কলাকৌশল এত ও এতরকমের যে গুনে শেষ হয় না। মিল, মধ্য-মিল, অর্ধ-মিল, স্বর-মিল -- সদ্যোজাত অপূর্ব সে সব মিল -- শুধু মিলের আলোচনাতেই এক দীর্ঘ প্রবন্ধ দাঁড়িয়ে যায়। আবার মিল নেই এমন গানও অছে; সংস্কৃত-বহুল গাম্ভীর্য থেকে একেবারে মুখের ভাষার স্বচ্ছ সরলতা পর্যন্ত বাংলা ভাষায় সম্ভব এমন-কোনো আলো-ছায়ার খেলা নেই, যা ধরা না পড়েছে তাঁর গানে; চায়ের গানের মতো যেন বাজী ধ'রে লেখা স্রেফ কারিগরির রচনাও আছে, যদিও সংখ্যায় নগণ্য; 'মেঘের পরে মেঘ জমেছে'-র মতো তরল শিশু-ভাষা থেকে 'অহো এ কী নিদারুণ স্পর্ধা, অর্জুনে যে করে অশ্রদ্ধা!'-র মতো অসম্ভব যুক্তাক্ষর পর্যন্ত সব রকম কথা, সব রকম ধ্বনিবিন্যাস অনায়াসে বসেছে। ছন্দের বৈচিত্র্যের তো শেষ নেই। যে-তিনমাত্রার ছন্দ রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য তার নানারকম রূপের ব্যবহার গানে পৌনঃ-পুনিক, আছে ছড়ার ছন্দ, আছে পয়ার, আছে ছন্দের নানা নতুন ঢং। ... মনে হয় বাংলা ভাষায় পদ্যের ছন্দে যত রকম আওয়াজ যত রকম সুর বের করা সম্ভব সব তিনি নিঃশেষ করে দিয়েছেন তাঁর গানে। কলাকৌশল বিস্ময়কর, কিন্তু চায়ের গানের মতো দু'একটি ঈষৎ লঘু রসের রচনা ছাড়া কোথাও মনে হয় না কোনো কৌশল আছে, মনে হয় এরা আপনিই হয়েছে, বিশ্বপ্রকৃতির বিভিন্ন ভঙ্গির মতো একটি আদিম অনির্বচনীয়তা নিয়ে এরা কাছে এসে দাঁড়ায়। আমার মনে হয় এখানেই কবিতার উপর গানের জিৎ। কবিতা যত ভালোই হোক তার কলাকৌশল দেখতে পাই, কলকব্জাগুলোর নামও জানি, কবি কী করতে চেয়েছেন ও কী করেছেন তা বুঝতে পেরে তাঁর দক্ষতার তারিফ করি শত মুখে, কিন্তু গানে -- রবীন্দ্রনাথের গানের মতো গানে -- সমগ্র জিনিষটি এক ধাক্কায় এক সঙ্গে হৃদয়ে এসে ঢোকে, ব্যাপারটা কী হলো তা বোঝবার সময় পাওয়া যায় না। বিশুদ্ধ কবিতা ব'লে কিছু যদি থাকে তা এই গান।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১০