গীতবিতান-GITABITAN
আমি একলা চলেছি এ ভবে

Signature

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯৭ (১৮৯০)
কবির বয়স: ২৯
প্রকাশ: জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৭ , বিসর্জন নাটক র-র ২ |
গানের বহি (বিবিধ)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): বিচিত্র-বিচিত্র; ২১/৫৫২
রাগ / তাল: মিশ্র দেশ / দাদরা
স্বরলিপি: বিসর্জন (১৩৩৯-৫১); স্বরবিতান ২৮ (বিসর্জন)
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার; ঐ
পাদটিকা:
৩য় দৃশ্য, অপর্ণার গান। কাওয়ালি [ কা-সূ ]।  

আলোচনা

সেবার কলকাতায়, যতদূর মনে পড়ে ১৯২৩ সালের আগস্ট মাসে হবে বোধহয়, এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটক অভিনীত হয় চারদিন ধরে। জয়সিংহের ভূমিকায় নেমেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আর বিশিষ্ট ভূমিকাগুলিতে নেমেছিলেন--

    রঘুপতি - দিনুদা (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর); অপর্ণা - কুমারী রাণু অধিকারী (পরে লেডি রাণু মুখার্জি) ও কুমারী মঞ্জু ঠাকুর (সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা, ইনি একদিনই অভিনয় করেছিলেন); গোবিন্দমাণিক্য - রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর; গুণবতী - সংজ্ঞা দেবী (সুরেন্দ্রনাথের স্ত্রী); নক্ষত্র রায় - তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র)। (১২৪)  

গোটা দশেক গান দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাকেও এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। এই দশটি গানের মধ্যে 'বিসর্জন'-এর জন্যে আগেকার রচিত গান ছিল তিনটি। এই তিনটি গান হচ্ছে-- ' ওগো পুরবাসী '; ' আমি একলা চলেছি এ ভবে ' আর ' থাকতে আর ত পারলিনে মা '। এই তিনটি গান ছাড়াও কবির পুরনো গান থেকে কবি বেছে দেন-- ' তিমিরদুয়ার খোলো ' আর ' দিন ফুরালো হে সংসারী '-- এই গান দুটি। নতুন করে রচনা করে দেন আরও পাঁচটি গান। সেগুলি হচ্ছে-- ' ও আমার আঁধার ভালো '; ' কোন্‌ ভীরুকে ভয় দেখাবি '; ' আঁধার রাতে একলা পাগল '; ' আমায় যাবার বেলা পিছু ডাকে ' আর ' জয় জয় পরমা নিষ্কৃতি '। শেষের এই পাঁচটি গান আমাকে শেখান তাঁদের জোড়াসাঁকোর পুরানো বড় বাড়িতে (৬নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন) দোতলায় সামনের দিকের বসার ঘরে বসে। প্রতিটি গান তিনি নিজের হাতে লিখে দেন। ... তাঁর পায়ের কাছে বসে বসে গানগুলি শিখেছিলাম। কি যত্ন আর ভালোবাসা নিয়ে তিনি যে  গান শেখাতেন। ... গান জিনিসটা তাঁর কত প্রিয় ছিল, গান শুনতে যত ভালোবাসতেন শেখাতেও ততই ভালোবাসতেন। দুটোতেই দেখেছি সমান দরদ, সমানই আনন্দ পেতেন। নিজে গাইতেও ভালোবাসতেন। (১২৪)  
     --সাহানা দেবী, স্মৃতির খেয়া, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা, ২০০৪  



আমরা কাল [২১শে অগাস্ট, ১৯২৩ -  ১২ ভাদ্র ১৩৩০] এম্পায়ার থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের "বিসর্জন" নাটকের অভিনয় দেখিতে গিয়াছিলাম। "বিশ্বভারতী'র সাহায্য্কল্পে অভিনয়ের আয়োজন হইয়াছিল এবং প্রধানত উহারই ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকেরা প্রধান প্রধান চরিত্রের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। অভিনয়ের সাজসজ্জা বিশেষত বর্ণ-সমাবেশ, উচ্চ শিল্পকলার পরিচায়ক। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ জয় সিংহের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার অভিনয়চাতুর্যের বর্ণনা করা আমাদের সাধ্যায়ত্ত নয়। জয় সিংহের চরিত্রে লোকাচার ও ধর্ম, অন্ধ বিশ্বাস ও মানব হৃদয়ের মধ্যে পদে পদে যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ফুটিয়া উঠিয়াছে-- রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ে তাহা মূর্তিমান হইয়া দেখা দিয়াছিল। এরূপ উচ্চাঙ্গের অভিনয়কলা দর্শনের সৌভাগ্য সকল সময় হয় না। রাজার ভূমিকায় কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথ কৃতিত্ব প্রকাশ করিয়াছিলেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের পরেই রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথের অভিনয় উল্লেখ করিতে হয়। অপর্ণা ও রাণীর অভিনয়ও ভাল হইয়াছিল। শ্রীমতী সাহানা বসু মধুর সঙ্গীতে সকলকে মুগ্ধ করিয়াছেন। এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চ লোকে লোকারণ্য; দেখিয়া মনে হইল অভিনয়ের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে। আমরা 'বিসর্জন' অভিনয় দর্শনে বাস্তবিকই খুবই প্রীত হইয়াছি। (১৭২)
  
     --চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ১, আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দ পাবলিশার্স,১৯৯৩  


 

 

২১

আমি    একলা চলেছি এ ভবে,
আমায়   পথের সন্ধান কে কবে।
     ভয় নেই, ভয় নেই--
     যাও আপন মনেই
যেমন    একলা মধুপ ধেয়ে যায়
কেবল    ফুলের সৌরভে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯০ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: সাজাদপুরের কাছারি বাড়িতে বসে 'বিসর্জন' নাটক রচনা করলেন। কলকাতায় ফিরে এসে জোড়াসাঁকোতে অভিনয় হোলো, রবীন্দ্রনাথ রঘুপতি। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করে 'মন্ত্রী অভিষেক' প্রবন্ধ লেখেন ও এমারেল্ড থিয়েটারে পাঠ করেন। ২২শে অগাস্ট রওনা হয়ে ইটালী ও ফ্রান্স হয়ে লণ্ডন গেলেন, সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ আর বন্ধু লোকেন পালিত। নভেম্বরে দেশে প্রত্যাবর্তন। ৭ই ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তরস্থাপন উৎসবে অংশগ্রহণ। প্রকাশিত বই: বিসর্জন, মন্ত্রী অভিষেক, মানসী।

বহির্বিশ্বে: ভারতে প্রথম পথে বাইসাইকেল। ৩০ মে কলকাতার পথে প্রথম বিদ্যুতের আলো। সুরেশচন্দ্র সমাজপতির সম্পাদনায় 'সাহিত্য' পত্রিকার প্রকাশ।  শিল্পী ভ্যান গগের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইন্দুলেখা (মালয়ালম লেখক চণ্ডু মেনন), হাঙ্গার (হামসুন), পোয়েম্‌স (এমিলি ডিকিন্‌সন), দি গোল্ডেন বাও (ফ্রেজার)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



ধ্রুপদ খেয়াল ঠুংরি টপ্পা কীর্তন লোকসঙ্গীত -- এর প্রত্যেকটিই রবীন্দ্রনাথকে কমবেশী প্রভাবিত করেছিল, এবং সবকটিরই স্পষ্ট আভাস রবীন্দ্রসঙ্গীতে পাওয়া যায়। এ ছাড়া কিছু বিদেশী, কিছু কর্ণাটকী, আর ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের কিছু গানের প্রতিরূপও তাঁর গানে দেখি। এর বাইরে যা আছে, সেগুলিকে একেবারে নতুন জিনিস বলা চলে। তাতে রাগরাগিণীর বা অন্য কোনো প্রচলিত রীতির আমেজ থাকতে পারে, কিন্তু তাতে তার মৌলিকত্ব কমে না। কোনো প্রচলিত রীতি যখন রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন তখনও তার কথায় বা সুরে বা ছন্দে কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য এনেছেন। ফলে সেগুলিকে অনুকরণ না বলে নবীকরণ বলা চলতে পারে। বাংলা তথা ভারতীয় গানের এই নবীকৃত রূপই হল রবীন্দ্রসঙ্গীত।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।