গীতবিতান-GITABITAN
দিন ফুরালো হে সংসারী

Plaque

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩০৫ (১৮৯৯)
কবির বয়স: ৩৭
প্রকাশ: ১৯০৩ , কাব্যগ্রন্থ ৮ (ব্রহ্ম)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-বিবিধ; ৫১২/২০২
রাগ / তাল: ভীমপলশ্রী / মুক্তছন্দ
স্বরলিপি: বিশ্বভারতী পত্রিকা (১৩৮৪); স্বরবিতান ৬৩
স্বরলিপিকার: প্রফুল্লকুমার দাস
পাদটিকা:
হিন্দি-ভাঙা (ধ্রুপদ), সানাইয়ের গৎ, (আড়াঠেকা), সূত্র- অমলা দাশ [ র-ভা ]। বিসর্জন নাটক অভিনয়কালে অন্তর্ভুক্ত। সাহানা দেবীর টেপ রেকর্ডের গান  ভিত্তি করে স্বরলিপি তৈরি করা হয়। তাল আড়াঠেকা [ কা-সূ ]।
পাঠভেদ:
ভোলো সব ভাবনা
  [ গীবিন ] ১ম সং ১৩৩৮।  

আলোচনা

মাসিমার [অমলা দাশ, চিত্তরঞ্জন দাশের ভগ্নী] গান শুনতে কবি খুব ভালবাসতেন। তখনকার দিনে মাসিমার সুকণ্ঠের খুব নাম ছিল। তাঁর গলা চড়ত তার সপ্তকের ধৈবত পর্যন্ত। আর তানের দানা ছিল পরিষ্কার। তাই কবি তার কণ্ঠের জন্য হিন্দী টপ্পার গান ভেঙে বাংলায় কথা বসিয়ে দিতেন। তার মধ্যে এই দুটি গান মাসিমার মুখে শুনতাম--

       কে বসিলে আজি হৃদয়াসনে
আর
     এ পরবাসে রবে কে হায়

পরে নহবত থেকে তোলা মাসিমার কণ্ঠে মিশ্র ভীমপলশ্রী রাগের একটি সুর শুনে কবি তাইতে কথা বসিয়ে দেন, এই গানটি হচ্ছে ' দিন ফুরালো হে সংসারী ', গানটি মাসিমা ছাড়া আর কেউ জানত না। পরে অবশ্য গানটি আমি মাসিমার কাছে শিখি। রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই গানটি আমি 'রবীন্দ্র ভারতী'র জন্যে টেপ করে দিয়েছি যাতে গানটি আমার জীবনের সঙ্গে সঙ্গে শেষ না হয়ে যায়। আর পরে কেউ চাইলে শিখে নেবার সুযোগ পায়।

আর একটি গান কবি মাসিমার গলার জন্যেই রচনা করে দিয়েছিলেন--   চিরসখা হে -- গানটি মাসিমা খুব গাইতেন।  
  

[১৯২৩ সালের অগাস্ট মাসে] 'বিসর্জন' হচ্ছে শুনেই আমি সন্ধ্যার দিকে যাই জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ীতে। ... আমাকে দেখেই কবির ইচ্ছে হল আমাকে দিয়ে এই নাটকে গান গাওয়াবেন। অমনি সঙ্গে সঙ্গে রচনা হয়ে গেল সব নতুন গান। আর এ সূত্রেই তিনি প্রথম জানতে পারলেন তাঁর 'দিন ফুরালো হে সংসারী' গানটি আমি জানি। আমার মাসিমার [অমলা দাশ, চিত্তরঞ্জন দাশের ভগ্নী] কাছে শিখেছিলাম। এই গানটি একমাত্র আমার মাসিমা অমলা দাশ ছাড়া আর কেউ জানত না। গানটির একটু ইতিহস আছে। শুনেছি আমার মাসিমা এই রাগপ্রধান গানের সুরটি কণ্ঠে তুলেছিলেন কোনও এক বিয়ে বাড়ির নহবৎ শুনে তাই থেকে। এবং রবীন্দ্রনাথ মাসিমার কণ্ঠে সুরটি শুনে তখুনি তাইতে কথা বসিয়ে দেন। মাসিমার কাছে আমি এই গানটি শিখেছিলাম শুনে কবি খুব উৎফুল্ল ও আশ্বস্তও হলেন। কেননা ওঁর ধারণা হয়েছিল মাসিমার মৃত্যুর সঙ্গে ওঁর এই গানটিও হয়ত বা লুপ্ত হয়ে গিয়ে থাকবে। তাই আমার কণ্ঠে গানটি শুনেই তখুনি স্থির করে ফেললেন গানটি আমাকে দিয়ে 'বিসর্জন'-এ গাওয়াতেই হবে। কবির সেই উজ্জ্বল চোখ আরও উজ্জ্বল করে বলা-- "তুমি জান গানটি? অমলা তোমায় শিখিয়েছিল? বড় ভালো হল। অমলা ছাড়া এ গানটি আর কেউই জানত না" আজও যেন সামনে দেখতে পাই। (১২৮)  
     --সাহানা দেবী, স্মৃতির খেয়া, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা, ২০০৪  



 

 

৫১২

    দিন ফুরালো হে সংসারী,
ডাকো তাঁরে ডাকো যিনি শ্রান্তিহারী॥
      ভোলো সব ভবভাবনা,
    হৃদয়ে লহো হে শান্তিবারি॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: ২২ অগাস্ট বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। শিলাইদহে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য পারিবারিক বিদ্যালয় শুরু করলেন। শান্তিনিকেতনে ৭ই পৌষের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রথম আচার্য হয়ে ভাষণ দিলেন রবীন্দ্রনাথ । অন্ধ কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। কুষ্টিয়াতে যে ব্যবসা শুরু করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথকে নিয়ে, বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে ম্যানেজার তহবিল তছরূপ করে, রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে পড়লেন ঋণজালে। 'ভারতী'র সম্পাদক পদ ছেড়ে দিলেন। প্রকাশ: কণিকা।

বহির্বিশ্বে: বেলুড় মঠ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা। লর্ড কার্জন এলেন ভারতের বড়লাট হয়ে। কলকাতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হোলো। বুয়র যুদ্ধ শুরু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম: দি রেজারেকশন (টলস্টয়), লিরিক্‌স অ্যাণ্ড রিদম্‌স (কার্দুচ্চি)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



(ধ্রুপদ) জিনিসটা এত ভালোবেসেছিলেন বলেই বোধ হয় একের পর এক এত আশ্চর্য সব ধ্রুপদাঙ্গ গান রচনা করে ব্রহ্মসঙ্গীতকে তিনি সমৃদ্ধ করতে পেরেছিলেন। ধ্রুপদের বাণী যেভাবে ভাবপ্রকাশে সহায়তা করে, সেটা স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথকে আকর্ষণ করেছিল। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে তাঁর রচিত ধ্রুপদ গানের মতো সর্বগুণসম্পন্ন রচনা কমই আছে। এর অনেকগুলিতেই অবশ্য তিনি হিন্দির ছাঁচ অবিকল বজায় রেখে কেবলমাত্র তাতে হিন্দির জায়গায় বাংলা কথা বসিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও তিনি যে শুধু কাব্যগুণেই মূল রচনাকে অতিক্রম করে গেছেন তা নয়। ভাবের সঙ্গে শব্দের হ্রস্বদীর্ঘ স্বরব্যঞ্জনের সুনিপুণ প্রয়োগে সাঙ্গীতিক ধ্বনিবিচারেও হিন্দিকে অনায়াসে ছাড়িয়ে গেছেন।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।  


এই সময় [১৮৮৬] তাঁর গানও শুনেছি। কণ্ঠস্বরের এতাদৃশ ঐশ্বর্য আমি পূর্বে কখনও শুনিনি। বিলেতি বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে দুটি যন্ত্র আমাকে মুগ্ধ করত। একটি 'cornet', অপরটি 'cello'; তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল 'cornet--জাতীয়, 'cello'-জাতীয় নয়। প্রাণের উচ্ছ্বাস এ কণ্ঠস্বরের বিশেষত্ব ছিল। তিনি একটি হিন্দি গান গেয়েছিলেন, যা আমার আজও মনে আছে। তার প্রথম কথাগুলি "জন ছুঁইয়া মোরি বঁইয়া নাগরওয়া"। এ গানটির সুর বোধহয় তোড়ী, নয়ত সেই ঘরের। এ রাগে গলা খোলবার ও তোলবার যথেষ্ট অবসর আছে। আর তাঁর সুর তারার পঞ্চম পর্যন্ত অবলীলাক্রমে উঠে যেত। কিন্তু সে-সময়ে লক্ষ্য করি যে, তিনি তানের পক্ষপাতী ছিলেন না, খেয়ালের বে-পরোয়া তানের ও টপ্পার অবিশ্রান্ত কম্পনের সাধনা তিনি করেননি। সঙ্গীতের এ দুই কাজ বাঙ্গালীদের কোনকালেই শ্রোত্র-রসায়ন নয়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কানে এ জাতীয় টপ্পাখেয়াল শ্রুতিকটু। সুর যখন কথার সঙ্গে সন্ধিবিচ্ছেদ করে' যন্ত্র-সঙ্গীতের বৃথা নকল করে, কবির কানে তা গ্রাহ্য হয় না। আমি বুঝলুম যে, ধ্রুপদ অঙ্গের গানেই তাঁর কান অভ্যস্ত।  
     রবীন্দ্রনাথের স্বরচিত গানের বিশেষত্বও এই। তাঁর অন্তরের অদম্য প্রাণশক্তি সঙ্গীতশাস্ত্রের বিধিনিষেধ অতিক্রম করতে বাধ্য।  
     --প্রমথ চৌধুরী, রবীন্দ্র-পরিচয়, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)  


সেবার কলকাতায়, যতদূর মনে পড়ে ১৯২৩ সালের আগস্ট মাসে হবে বোধহয়, এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটক অভিনীত হয় চারদিন ধরে। জয়সিংহের ভূমিকায় নেমেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আর বিশিষ্ট ভূমিকাগুলিতে নেমেছিলেন--

    রঘুপতি - দিনুদা (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর); অপর্ণা - কুমারী রাণু অধিকারী (পরে লেডি রাণু মুখার্জি) ও কুমারী মঞ্জু ঠাকুর (সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা, ইনি একদিনই অভিনয় করেছিলেন); গোবিন্দমাণিক্য - রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর; গুণবতী - সংজ্ঞা দেবী (সুরেন্দ্রনাথের স্ত্রী); নক্ষত্র রায় - তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র)। (১২৪)  

গোটা দশেক গান দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাকেও এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। এই দশটি গানের মধ্যে 'বিসর্জন'-এর জন্যে আগেকার রচিত গান ছিল তিনটি। এই তিনটি গান হচ্ছে-- ' ওগো পুরবাসী '; ' আমি একলা চলেছি এ ভবে ' আর ' থাকতে আর ত পারলিনে মা '। এই তিনটি গান ছাড়াও কবির পুরনো গান থেকে কবি বেছে দেন-- ' তিমিরদুয়ার খোলো ' আর ' দিন ফুরালো হে সংসারী '-- এই গান দুটি। নতুন করে রচনা করে দেন আরও পাঁচটি গান। সেগুলি হচ্ছে-- ' ও আমার আঁধার ভালো '; ' কোন্‌ ভীরুকে ভয় দেখাবি '; ' আঁধার রাতে একলা পাগল '; ' আমায় যাবার বেলা পিছু ডাকে ' আর ' জয় জয় পরমা নিষ্কৃতি '। শেষের এই পাঁচটি গান আমাকে শেখান তাঁদের জোড়াসাঁকোর পুরানো বড় বাড়িতে (৬নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন) দোতলায় সামনের দিকের বসার ঘরে বসে। প্রতিটি গান তিনি নিজের হাতে লিখে দেন। ... তাঁর পায়ের কাছে বসে বসে গানগুলি শিখেছিলাম। কি যত্ন আর ভালোবাসা নিয়ে তিনি যে  গান শেখাতেন। ... গান জিনিসটা তাঁর কত প্রিয় ছিল, গান শুনতে যত ভালোবাসতেন শেখাতেও ততই ভালোবাসতেন। দুটোতেই দেখেছি সমান দরদ, সমানই আনন্দ পেতেন। নিজে গাইতেও ভালোবাসতেন। (১২৪)  
     --সাহানা দেবী, স্মৃতির খেয়া, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা, ২০০৪  


আমরা কাল [২১শে অগাস্ট, ১৯২৩ -  ১২ ভাদ্র ১৩৩০] এম্পায়ার থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের "বিসর্জন" নাটকের অভিনয় দেখিতে গিয়াছিলাম। "বিশ্বভারতী'র সাহায্য্কল্পে অভিনয়ের আয়োজন হইয়াছিল এবং প্রধানত উহারই ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকেরা প্রধান প্রধান চরিত্রের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। অভিনয়ের সাজসজ্জা বিশেষত বর্ণ-সমাবেশ, উচ্চ শিল্পকলার পরিচায়ক। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ জয় সিংহের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার অভিনয়চাতুর্যের বর্ণনা করা আমাদের সাধ্যায়ত্ত নয়। জয় সিংহের চরিত্রে লোকাচার ও ধর্ম, অন্ধ বিশ্বাস ও মানব হৃদয়ের মধ্যে পদে পদে যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ফুটিয়া উঠিয়াছে-- রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ে তাহা মূর্তিমান হইয়া দেখা দিয়াছিল। এরূপ উচ্চাঙ্গের অভিনয়কলা দর্শনের সৌভাগ্য সকল সময় হয় না। রাজার ভূমিকায় কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথ কৃতিত্ব প্রকাশ করিয়াছিলেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের পরেই রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথের অভিনয় উল্লেখ করিতে হয়। অপর্ণা ও রাণীর অভিনয়ও ভাল হইয়াছিল। শ্রীমতী সাহানা বসু মধুর সঙ্গীতে সকলকে মুগ্ধ করিয়াছেন। এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চ লোকে লোকারণ্য; দেখিয়া মনে হইল অভিনয়ের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে। আমরা 'বিসর্জন' অভিনয় দর্শনে বাস্তবিকই খুবই প্রীত হইয়াছি। (১৭২)
  
     --চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ১, আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দ পাবলিশার্স,১৯৯৩