গীতবিতান-GITABITAN
আঁধার রাতে একলা পাগল যায় কেঁদে।

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ভাদ্র ১৩৩০ (১৯২৩)
কবির বয়স: ৬২
প্রকাশ: ১৯২৫ , প্রবাহিণী (পূজা) |
বিসর্জন
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-শেষ; ৫৮৬/২৩০
রাগ / তাল: কানাড়া-খাম্বাজ / কাহারবা
স্বরলিপি: স্বরবিতান ১
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাদটিকা:
১৯২৩ সালে এম্পায়ার মঞ্চে বিসর্জন নাটকের অভিনয়কালে গীত। ". . . গানের গীতরীতি সম্পর্কে বিশেষ অবহিত হওয়া আবশ্যক"।  
[ স্বর ]  

আলোচনা

আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  



সেবার কলকাতায়, যতদূর মনে পড়ে ১৯২৩ সালের আগস্ট মাসে হবে বোধহয়, এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটক অভিনীত হয় চারদিন ধরে। জয়সিংহের ভূমিকায় নেমেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আর বিশিষ্ট ভূমিকাগুলিতে নেমেছিলেন--

    রঘুপতি - দিনুদা (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর); অপর্ণা - কুমারী রাণু অধিকারী (পরে লেডি রাণু মুখার্জি) ও কুমারী মঞ্জু ঠাকুর (সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা, ইনি একদিনই অভিনয় করেছিলেন); গোবিন্দমাণিক্য - রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর; গুণবতী - সংজ্ঞা দেবী (সুরেন্দ্রনাথের স্ত্রী); নক্ষত্র রায় - তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র)। (১২৪)  

গোটা দশেক গান দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাকেও এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। এই দশটি গানের মধ্যে 'বিসর্জন'-এর জন্যে আগেকার রচিত গান ছিল তিনটি। এই তিনটি গান হচ্ছে-- ' ওগো পুরবাসী '; ' আমি একলা চলেছি এ ভবে ' আর ' থাকতে আর ত পারলিনে মা '। এই তিনটি গান ছাড়াও কবির পুরনো গান থেকে কবি বেছে দেন-- ' তিমিরদুয়ার খোলো ' আর ' দিন ফুরালো হে সংসারী '-- এই গান দুটি। নতুন করে রচনা করে দেন আরও পাঁচটি গান। সেগুলি হচ্ছে-- ' ও আমার আঁধার ভালো '; ' কোন্‌ ভীরুকে ভয় দেখাবি '; ' আঁধার রাতে একলা পাগল '; ' আমায় যাবার বেলা পিছু ডাকে ' আর ' জয় জয় পরমা নিষ্কৃতি '। শেষের এই পাঁচটি গান আমাকে শেখান তাঁদের জোড়াসাঁকোর পুরানো বড় বাড়িতে (৬নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন) দোতলায় সামনের দিকের বসার ঘরে বসে। প্রতিটি গান তিনি নিজের হাতে লিখে দেন। ... তাঁর পায়ের কাছে বসে বসে গানগুলি শিখেছিলাম। কি যত্ন আর ভালোবাসা নিয়ে তিনি যে  গান শেখাতেন। ... গান জিনিসটা তাঁর কত প্রিয় ছিল, গান শুনতে যত ভালোবাসতেন শেখাতেও ততই ভালোবাসতেন। দুটোতেই দেখেছি সমান দরদ, সমানই আনন্দ পেতেন। নিজে গাইতেও ভালোবাসতেন। (১২৪)  
     --সাহানা দেবী, স্মৃতির খেয়া, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা, ২০০৪  


আমরা কাল [২১শে অগাস্ট, ১৯২৩ -  ১২ ভাদ্র ১৩৩০] এম্পায়ার থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের "বিসর্জন" নাটকের অভিনয় দেখিতে গিয়াছিলাম। "বিশ্বভারতী'র সাহায্য্কল্পে অভিনয়ের আয়োজন হইয়াছিল এবং প্রধানত উহারই ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকেরা প্রধান প্রধান চরিত্রের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। অভিনয়ের সাজসজ্জা বিশেষত বর্ণ-সমাবেশ, উচ্চ শিল্পকলার পরিচায়ক। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ জয় সিংহের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার অভিনয়চাতুর্যের বর্ণনা করা আমাদের সাধ্যায়ত্ত নয়। জয় সিংহের চরিত্রে লোকাচার ও ধর্ম, অন্ধ বিশ্বাস ও মানব হৃদয়ের মধ্যে পদে পদে যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ফুটিয়া উঠিয়াছে-- রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ে তাহা মূর্তিমান হইয়া দেখা দিয়াছিল। এরূপ উচ্চাঙ্গের অভিনয়কলা দর্শনের সৌভাগ্য সকল সময় হয় না। রাজার ভূমিকায় কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথ কৃতিত্ব প্রকাশ করিয়াছিলেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের পরেই রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথের অভিনয় উল্লেখ করিতে হয়। অপর্ণা ও রাণীর অভিনয়ও ভাল হইয়াছিল। শ্রীমতী সাহানা বসু মধুর সঙ্গীতে সকলকে মুগ্ধ করিয়াছেন। এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চ লোকে লোকারণ্য; দেখিয়া মনে হইল অভিনয়ের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে। আমরা 'বিসর্জন' অভিনয় দর্শনে বাস্তবিকই খুবই প্রীত হইয়াছি। (১৭২)
  
     --চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ১, আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দ পাবলিশার্স,১৯৯৩  


গানটা গাইতে গেলে স্বরবিন্যাসের উচ্চাবচ কৌশল তাক লাগিয়ে দেয়। নিচু পর্দায় শুরু হয়ে এই গান যে কত ক্রমোচ্চ বিভঙ্গে পৌঁছে যায় চরমে, ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। কেন জানিনা, আগেকার দিনে শোনা যাত্রার বিবেকের কণ্ঠক্ষেপণের সঙ্গে এ গানের মর্মমিল পাই। গানটি নিতান্তই পুরুষকণ্ঠের উপযোগী। বুঝিয়ে দে বুঝিয়ে দে বুঝিয়ে দে-- তিনভাবে তিন আলাদা স্বরবিন্যাসে গাওয়া বেশ সাধনা সাপেক্ষ। শেষ 'বুঝিয়ে দে' উচ্চারণে গলার কেরামতির সঙ্গে লাগে হিম্মৎ। (৩৮)  
     --সুধীর চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথ অনেকান্ত, পত্রলেখা, ২০১২  


 

 

৫৮৬

          আঁধার রাতে একলা পাগল যায় কেঁদে।
  বলে শুধু, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে॥
          আমি যে তোর আলোর ছেলে,
আমার      সামনে দিলি আঁধার মেলে,
                মুখ লুকালি-- মরি আমি সেই খেদে॥
       অন্ধকারে অস্তরবির লিপি লেখা,
              আমারে তার অর্থ শেখা।
       তোর  প্রাণের বাঁশির তান সে নানা
              সেই আমারই ছিল জানা,
         আজ    মরণ-বীণার অজানা সুর নেব সেধে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯২৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  ৯ই জানুয়ারি বড়ো ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। প্রথম আসাম ও শিলং পাহাড়ে ভ্রমণ। বিশ্বভারতীর ট্রাস্ট ডীড করা হোলো আর প্রকাশন বিভাগের হোলো সূত্রপাত। 'বিসর্জন' অভিনয়ে জয়সিংহ। 'পূরবী' রচনা। প্রকাশ: বসন্ত, ছুটির পড়া, The Visva-Bharati.  

বহির্বিশ্বে: ১লা জানুয়ারি স্বরাজ্য পার্টির জন্ম -- দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও পণ্ডিত মতিলাল নেহরুর উদ্যোগে। স্পেনে একনায়কতন্ত্রের শাসন। নেপাল স্বাধীন। তুরস্কে গণতন্ত্র, আতাতুর্ক প্রথম রাষ্ট্রপতি। টেলিভিশন আবিষ্কার। সারা বার্নহার্ট ও পিয়ের লোতির মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ফিলজফি অফ সিভিলাইজেশন (সোয়াইৎজার), সেণ্ট জোন (শ), এরিয়েল (মরোয়া), দি ডাভ্‌স নেস্ট (ম্যানস্‌ফিল্ড)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রনাথের গান নিজেকে রচনা করে তুলবার গান। এ এক বিরামহীন আত্মজাগরণের আত্মদীক্ষার গান: অন্তত সেইখানে সে আমার কাছে ভালো। দীক্ষার এই বেদি থেকে প্রতিদিনের আত্মচরিতের দিকে তাকিয়ে দেখি। দেখি, এমন কোনো পদ্ম গড়ে ওঠেনি আমার স্বভাবের মাঝখানে যেখানে এসে পা রাখবে শ্রী, সৌন্দর্য। এই বোধ থেকে শুরু হলো কান্না, অপচয়ের অক্ষমতার অপূর্ণতার কান্না। হঠাৎ এক মস্ত গহ্বরের সামনে এসে পড়ি আমরা, উত্তরহীন সমাধানহীন এক প্রশ্নব্যাকুলতার তীব্র স্বাদ তাঁর গানে এসে লাগে কখনো। অন্ধকার পথে একলা পাগলের মুখে আর্তনাদ শুনি তখন: 'বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে' ['আঁধার রাতে একলা পাগল']। এই পাগলটিই শুধু আমাদের মতো একজন, যে জানেনা কোনো শেষকথা, বুঝতে চায় কেবল। অস্তাচলের আকাশ দেখে এর মনে হয় না যে কোন্‌ অন্তহীন পশ্চিমের দিকে তার পতিগৃহ, মনে হয় না এ কোনো সোনার বিবাহসাজ, বরং এ দাবি করে: 'আমারে তার অর্থ শেখা'। এই পাগলটির উচ্চারণের সঙ্গে-সঙ্গে তাই মথিত হয়ে ওঠে আমাদের সমস্ত আধুনিক কাতরতা। (২২)  
     --শঙ্খ গোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  


দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রসংগীত পরিণত রূপ লাভ করবার পর রাগ নিজেই সমরূপের রাগের বিভিন্ন বৈচিত্র্যে বিকাশ লাভ করেছে। তাই, দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, একটি ছায়ানট বহু ছায়ানটে বিস্তারলাভ করেছে। উচ্চাঙ্গসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীতে পার্থক্য হলো এই যে উচ্চাঙ্গসংগীতে রাগবৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায় এক থেকে দশ পর্যন্ত। যেমন, ভৈরবীতে একটি, টোড়ীতে ছয়টি এবং কানাড়াতে দশটি। রবীন্দ্রসংগীত অসংখ্য গানে বিভক্ত। তাতে অনেকগুলি ভৈরবী, অনেকগুলি টোড়ী ও অনেকগুলি কানাড়া সৃষ্ট হয়েছে। প্রত্যেকটি গান স্বতন্ত্র এক একটি রাগরূপ। এতে গায়কের নিজস্ব রাগারোপের কোনো অবকাশ নেই। ... দু হাজারের বেশী সুর তিনি রচনা করেছেন। তার মধ্যে দেড়শো সুর বাস্তবিকই অতি উৎকৃষ্ট। প্রত্যেকটি রবীন্দ্রনাথের রাগপদ্ধতির অন্তর্গত এবং প্রত্যেকটি এক একটি স্বতন্ত্র সংগীত।⤥  
     --ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের গান, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত রবীন্দ্রসংগীতের চিন্তা, প্রতিভাস, ১৯৯৩