গীতবিতান-GITABITAN
তিমিরদুয়ার খোলো-- এসো, এসো নীরবচরণে।

Signature

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ফাল্গুন ১৩১৫ (১৯০৮)
কবির বয়স: ৪৭
প্রকাশ: জ্যৈষ্ঠ ১৩১৬ , প্রবাসী |
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা;গান (১৯০৯, ব্রহ্ম)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-বিবিধ; ৪৬৫/১৮৪
রাগ / তাল: রামকেলি / ত্রিতাল
স্বরলিপি: প্রবাসী; গীতলিপি ২; বৈতালিক; স্বরবিতান ৩৬ ;স্বরবিতান ৬৬ (শিশুতীর্থ)
স্বরলিপিকার: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; ঐ; দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; ঐ
পাদটিকা:
১৩১৬ মাঘোৎসবে গীত। ১৩৩০ ভাদ্রে বিসর্জন নাটকের অভিনয়কালে গানটি গাওয়া হয়।  "শিশুতীর্থ" গদ্য্কবিতার যে নৃত্যাভিনয় কবি ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় উপস্থাপন করেছিলেন তাতে অপরিবর্তিত রূপে ব্যবহৃত।
মিশ্র রামকেলী [ স্বর ]।
বৈতালিকের দিনেন্দ্রনাথকৃত স্বরলিপির সঙ্গে সুরভেদ আছে।  

আলোচনা

সেবার কলকাতায়, যতদূর মনে পড়ে ১৯২৩ সালের আগস্ট মাসে হবে বোধহয়, এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটক অভিনীত হয় চারদিন ধরে। জয়সিংহের ভূমিকায় নেমেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আর বিশিষ্ট ভূমিকাগুলিতে নেমেছিলেন--

    রঘুপতি - দিনুদা (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর); অপর্ণা - কুমারী রাণু অধিকারী (পরে লেডি রাণু মুখার্জি) ও কুমারী মঞ্জু ঠাকুর (সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা, ইনি একদিনই অভিনয় করেছিলেন); গোবিন্দমাণিক্য - রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর; গুণবতী - সংজ্ঞা দেবী (সুরেন্দ্রনাথের স্ত্রী); নক্ষত্র রায় - তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র)। (১২৪)  

গোটা দশেক গান দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাকেও এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। এই দশটি গানের মধ্যে 'বিসর্জন'-এর জন্যে আগেকার রচিত গান ছিল তিনটি। এই তিনটি গান হচ্ছে-- ' ওগো পুরবাসী '; ' আমি একলা চলেছি এ ভবে ' আর ' থাকতে আর ত পারলিনে মা '। এই তিনটি গান ছাড়াও কবির পুরনো গান থেকে কবি বেছে দেন-- ' তিমিরদুয়ার খোলো ' আর ' দিন ফুরালো হে সংসারী '-- এই গান দুটি। নতুন করে রচনা করে দেন আরও পাঁচটি গান। সেগুলি হচ্ছে-- ' ও আমার আঁধার ভালো '; ' কোন্‌ ভীরুকে ভয় দেখাবি '; ' আঁধার রাতে একলা পাগল '; ' আমায় যাবার বেলা পিছু ডাকে ' আর ' জয় জয় পরমা নিষ্কৃতি '। শেষের এই পাঁচটি গান আমাকে শেখান তাঁদের জোড়াসাঁকোর পুরানো বড় বাড়িতে (৬নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন) দোতলায় সামনের দিকের বসার ঘরে বসে। প্রতিটি গান তিনি নিজের হাতে লিখে দেন। ... তাঁর পায়ের কাছে বসে বসে গানগুলি শিখেছিলাম। কি যত্ন আর ভালোবাসা নিয়ে তিনি যে  গান শেখাতেন। ... গান জিনিসটা তাঁর কত প্রিয় ছিল, গান শুনতে যত ভালোবাসতেন শেখাতেও ততই ভালোবাসতেন। দুটোতেই দেখেছি সমান দরদ, সমানই আনন্দ পেতেন। নিজে গাইতেও ভালোবাসতেন। (১২৪)  
     --সাহানা দেবী, স্মৃতির খেয়া, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা, ২০০৪  



আমরা কাল [২১শে অগাস্ট, ১৯২৩ -  ১২ ভাদ্র ১৩৩০] এম্পায়ার থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের "বিসর্জন" নাটকের অভিনয় দেখিতে গিয়াছিলাম। "বিশ্বভারতী'র সাহায্য্কল্পে অভিনয়ের আয়োজন হইয়াছিল এবং প্রধানত উহারই ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকেরা প্রধান প্রধান চরিত্রের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। অভিনয়ের সাজসজ্জা বিশেষত বর্ণ-সমাবেশ, উচ্চ শিল্পকলার পরিচায়ক। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ জয় সিংহের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার অভিনয়চাতুর্যের বর্ণনা করা আমাদের সাধ্যায়ত্ত নয়। জয় সিংহের চরিত্রে লোকাচার ও ধর্ম, অন্ধ বিশ্বাস ও মানব হৃদয়ের মধ্যে পদে পদে যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ফুটিয়া উঠিয়াছে-- রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ে তাহা মূর্তিমান হইয়া দেখা দিয়াছিল। এরূপ উচ্চাঙ্গের অভিনয়কলা দর্শনের সৌভাগ্য সকল সময় হয় না। রাজার ভূমিকায় কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথ কৃতিত্ব প্রকাশ করিয়াছিলেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের পরেই রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথের অভিনয় উল্লেখ করিতে হয়। অপর্ণা ও রাণীর অভিনয়ও ভাল হইয়াছিল। শ্রীমতী সাহানা বসু মধুর সঙ্গীতে সকলকে মুগ্ধ করিয়াছেন। এম্পায়ার রঙ্গমঞ্চ লোকে লোকারণ্য; দেখিয়া মনে হইল অভিনয়ের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে। আমরা 'বিসর্জন' অভিনয় দর্শনে বাস্তবিকই খুবই প্রীত হইয়াছি। (১৭২)
  
     --চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ১, আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দ পাবলিশার্স,১৯৯৩  


 

 

৪৬৫

তিমিরদুয়ার খোলো-- এসো, এসো নীরবচরণে।
জননী আমার, দাঁড়াও এই নবীন অরুণকিরণে॥
পুণ্যপরশপুলকে সব আলস যাক দূরে।
গগনে বাজুক বীণা জগত-জাগানো সুরে।
জননী, জীবন জুড়াও তব প্রসাদশুধাসমীরণে।
জননী, আমার, দাঁড়াও মম জ্যোতিবিভাসিত নয়নে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯০৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ দিলেন বাংলায় -- এই পরিবেশে এই প্রথম। ক্ষিতিমোহন সেন এলেন শান্তিনিকেতনে, শ্রাবণ মাসে বর্ষা উৎসবের সূচনা হোলো তাঁর এবং বিধুশেখরের উৎসাহে। শারোদৎসবের সূচনা, 'শারদোৎসব' রচনা ও অভিনয়। শান্তিনিকেতনে বালিকা বিদ্যালয়ের সূচনা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নতুন ভবনের দ্বারোদ্ঘাটন করলেন। পতিসরে কালীমোহন ঘোষ ও আরো কয়েকজন কর্মী নিয়ে পল্লী সংগঠনের কাজ শুরু হোলো। প্রকাশ: প্রজাপতির নির্বন্ধ, প্রহসন, রাজা ও প্রজা, সমূহ, স্বদেশ, সমাজ, শিক্ষা (সবগুলি গদ্যগ্রন্থাবলীর বিভিন্ন খণ্ডরূপে), কথা ও কাহিনী, গান, শারদোৎসব, মুকুট।

বহির্বিশ্বে: ১লা মার্চ টাটা আয়রন অ্যাণ্ড স্টিল কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত। সংবাদপত্রে সরকারের সমালোচনা লেখায় বালগঙ্গাধর টিলক গ্রেপ্তার হলেন। মাণিকতলার বাগানবাড়িতে বোমা তৈরির মশলা পাওয়ায় অন্য অনেকের সঙ্গে বারীন্দ্র ও অরবিন্দ ঘোষ গ্রেপ্তার হলেন।  ১১ই অগাস্ট ক্ষুদিরাম দাসের ফাঁসি। আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা শুরু-- অরবিন্দ ঘোষ অন্যতম অভিযুক্ত, চিত্তরঞ্জন দাশ আসামী পক্ষের ব্যারিস্টার। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিলেত থেকে ফিরে 'হিন্দুস্থান কোঅপারেটিভ সোসাইটি'র পরিচালকত্ব গ্রহণ করলেন। টিলককে ৬ বছর মান্দালয় জেলে আবদ্ধ রাখার আদেশ। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্তন। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইয়ামা, দি পিট (কুপরিন), লে ইপেভ্‌স (প্রুদ্‌ম)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



গুরুদেবও বলতেন, দেখো, লেখাটা যেন আমার বড়োগিন্নি, আটপৌরে। সে সব সময় সকলের সামনেই বের হয়। কোনো দ্বিধা-সংকোচ নেই। ছবি হল আমার ছোটোগিন্নি, তাকে একটু তোয়াজ করলেই সে ভোলে। কিন্তু আমার মেজোগিন্নি-- আমার গান, সে যখন আমার কাছে আসে তখন কাউকেই সে সইতে পারে না। বড়ো অভিমানী। কেউ এল কি, অমনি সে যে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল-- কত সাধ্যসাধনা করে তবে আবার ফিরিয়ে আনতে হয় তাকে।

তাই দেখতামও, গুরুদেব যখন গানে সুর দিতেন, তখন কেউ কাছে গেলে সুর কেটে যেত। বড়ো কষ্ট হত তাঁর। গানে সুর দেবার সময় ধারে-কাছে কেউ থাকলে চলবে না। সুর দেওয়া হয়ে গেলে সেই মুহূর্তে ডেকে পাঠাতেন হাতের কাছে যে গাইয়ে পেতেন তাকে। তাড়াতাড়ি সে সুর অন্য কণ্ঠে দিয়ে দিতে না পারলে বিপদ ঘটত। নিজের দেওয়া সুর তিনি নিজেই ভুলে যেতেন। (১২২)  
     --রানী চন্দ, গুরুদেব, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, শ্রাবণ ১৩৯৪